EMAIL
PASSWORD

Register | Forgot your password?


জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ২০১০: চূRড়ান্ত


স্বাস্থ্য আন্দোলন
Thursday 04 February 10

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১০

আজ ১ ফেব্র“য়ারি, ২০১০ জাতীয প্রেসকব্জাবের হল রুমে স্বাস্থ্য আন্দোলনের পক্ষ থেকে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য আন্দোলনের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন ফরিদা আখতার, ডাঅ এ এম জাকির হোসেন, সৈয়দ আশেক মাহমুদ, নাজমুল করিম সবুজ, সীমা দাস সীমু, রোকেয়া বেগম, শামসুজ্জোহা প্রমুখ। সাংবাদিকদের মাঝে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন স্বাস্থ্য আন্দোলনের যুগ¡ আহবায়ক ফরিদা আখতার। বক্তব্য রাখেন ডাঅ এ এম জাকির হোসেন, সৈয়দ আশেক মাহমুদ, ফরিদা আখতার।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলনে জানা গেছে ওয়েবসাইট ও সরাসরি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ৩২ হাজার মতামত নিয়ে ‘মতামত সম্বলিত চূরান্ত খসড়া’ প্রকাশ করা হয়েছে। এবং ঘোষণা দেয়া হয়েছে আগামি তিন মাসের মধ্যে জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি, ২০১০ জাতিকে উপহার ‘দেয়া হবে। বলা হয়েছে আরো সুপারিশ এলে সেগুলোও বিবেচনায় নেয়া হবে। কিন্তু বর্তমানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইডে নতুন খসড়াটি নেই। ফলে কেউ মতামত দিতে চাইলেও দেওয়া সম্ভব নয়। নতুন খসড়াটি পাওয়া না গেলে মতামত দেয়া হবে কি ভাবে ? স্বাস্থ্য আন্দোলন নিজেদের উদ্যোগে খসড়াটি যোগার করেছে।

আমরা আশ্চর্য হয়েছি যে ৩২ হাজার মতামত নেয়া হয়েছে অথচ স্বাস্থ্য কর্মকান্ডের সাথে জড়িত কোন বিশেষজ্ঞ বিষয়টি পত্রিকায় দেখার আগ পর্যন্ত জানতেও পারেনি। এই ৩২ হাজার মতামত কারা দিয়েছেন সেটা জানতে পারলে ভাল হয়। কারণ আমরা যারা সক্রিয় আছি তাদের কেউই বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পারি নি । আমরা জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি, ২০০৯ এর খসড়া পাওয়ার পর থেকেই একটি গণমুখী স্বাস্থ্য নীতির জন্যে সেমিনার আয়োজন করে গোলটেবিল বৈঠক করে এবং সংবাদ সম্মেলন করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করে আসছি। কিšু— দুঃখজনকভাবে বলতে হয় যে সরকার মতামত নেয়ার ক্ষেত্রে দলীয় বিষয়টি বেশী গুরুত্ব দিচ্ছেন, সার্বিকভাবে জনগণের স্বাস্থ্য সেবার প্রদানের বিষয়টি দেখছেন না।

জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি প্রণয়নের আগেই দু,একটি সিদ্ধান্ত কার্যকর করে ফেলেছে যা জাতীয় স্বাস্থ্য নীতির লক্ষ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। হাসপাতালে ইউজার ফি ব্যবস্থা চালু করা সাধারণ জনগণের সহজলভ্য চিকিৎসা সেবা পাওয়ার পথকে বাধাগ্রস্ত করবে, যা মোটেও কাম্য নয়। তা ছাড়া স্বাস্থ্য সেবা পাওয়া মৌলিক অধিকার হলে এর সাথে ইউজার ফি নেয়া সম্পূর্ণ বিপরীমুখী।

নতুন খসড়ায় কয়েকটি বিষয় সংযোজন করা হয়েছে এবং একটি কমিটির স্বাক্ষরিত খসড়া হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। এই খসড়ার শেষ পৃষ্ঠায় ১২ জন কমিটি সদস্যের স্বাক্ষর আছে, তবে এই কমিটির কবে গঠিত হয়েছে এবং কারা সদস্য হয়েছেন তার কিছুই জানা যায় নি। অন্যান্যের মধ্যে এখানেও দাতা সংস্থার কনসালটেন্ট রয়েছেন দু‘একজন (যেমন পিএসও, ওয়াটার এইড) আবার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিবও আছেন। স্বাস্থ্য নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কোন বিশেষজ্ঞের নাম এখানে দেখা যাচ্ছে না। সবচেয়ে চোখে পড়ার মত বিষয় হচ্ছে কমিটিতে কোন নারী সদস্য নেই, এবং শিশু স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন, বা পুষ্টি বিশেষজ্ঞেও কেউ নেই, যা স্বাস্থ্য নীতির একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খসড়া চুরান্তকরণ কমিটির আহবায়ক অধ্যাপক ডাঃ খন্দকার মোঃ সিফায়েত উল্লাহ পরিচালক, চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ও জনশক্তি উন্নয়ন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, এবং সদস্য হচ্ছেন মাত্র ৫ জন, আর বাকী ৭ জন হচ্ছেন কো - অপটেড সদস্য। বারো সদস্যের কমিটির মধ্যে কো - অপটেড সদস্যের সংখ্যাধিক দেখে বুঝতে অসুবিধা হয়, আসলে খসড়াটি চুরান্ত করার ক্ষেত্রে কাদের মতামত বেশী গুরুত্ব পাবে। আমরা মনে করি জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি ২০১০ এখনো পূর্বের কাঠামো থেকে খুব একটা বেরিয়ে আসতে পারেনি, শুধু কিছু নতুন ভাল কথা জুড়ে দেয়া হয়েছে মাত্র। এটা দেখলে এখনো মনে হয় এটা একটা নীতি নয়, প্রকল্প প্রস্তাবনা, যা দাতা গোষ্টির জন্যে প্রয়োজন কিন্তু— জনগণের স্বাস্থ্য সেবা দেয়ার জন্যে সরকারি নীতি হতে পারে না। তাছাড়া আমরা বারবার দাবি করে আসছি একটি জাতীয় স্বাস্থ্য নীতির জন্যে কিন্তু— আমাদেরকে শুধু চিকিৎসা নীতি দেয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য সেবার সাথে সম্পর্কিত আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। তবুও আমরা স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই এবং এখনো আমরা সরকারকে আহবান জানাচ্ছি যে আগামি তিন মাসের মধ্যে একটি স্বাস্থ্যনীতি প্রনয়ণের জন্যে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো অর্ন্তভুক্ত করার জন্যে।স্বাস্থ্য আন্দোলনের সদস্যদেরও পক্ষ থেকে যে মতামত এসেছে তার সারমর্ম তুলে ধরা হল। স্বাস্থ্য নীতিতে যা নেই অথচ অবশ্য যুক্ত হওয়া উচিত এমন বিষয়গুলোর একটি তালিকা এখানে তুলে ধরা হচ্ছে।

১. স্বাস্থ্য মানুষের মৌলিক অধিকার, সংবিধানে বর্তমানে তা মৌলিক নীতির মধ্যে রয়েছে। এ বিষয়টি সংশোধন করার কথা বলা হয়নি।

২. স্বাস্থ্যনীতি সংসদে উল্কাপন করে আলোচনা ও পর্যালোচনা হয়ে চুরান্ত করা দরকার।

৩. সাধারণ জনগণ কি ভাবে ন্যুনতম স্বাস্থ্য সেবা পেতে পারে তার কোন দিক নির্দেশনা এতে নাই।

৪. স্বাস্থ্যনীতির লক্ষ্য এর মধ্যে অসংক্রামক রোগগুলি সুনির্দিষ্ট ভাবে আসেনি।

৫. স্বাস্থ্যনীতিতে পরিবেশ দূষণের বিষয় ও কারণগুলো সুনির্দিষ্ট ভাবে আসেনি।

৬. সুলভ মূল্যে নিরাপদ ওষুধ এবং সহজ প্রাপ্য ওষুধ যাতে জনগণ পেতে পারে সে ব্যাপারে পরিস্কার উল্লেখ থাকা দরকার।

৭. যেসব রোগীর ওষুধ কেনার সামর্থ নাই সরকারি হাসপাতালে তাকে বিনে পয়সায় ওষুধসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দেয়া হবে কিনা তা উল্লেখ থাকা উচিত।

৮. কোন রোগী যদি ভুল চিকিঔসার কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং মারা যায় তার জন্য কি করা হবে। এটা নীতিতে পরিস্কার ভাবে উল্লেখ করা উচিত।

৯. সকল চিকিঔসক সমান সুযোগ সুবিধা পাবে। সবাইকে পর্যায় ক্রমে গ্রামে যেতে হবে।

১০. নার্স, প্যারামেডিক, এদের উন্নয়নের কথা, সুযোগ সুবিধার কথা উল্লেখ থাকতে হবে।

১১. স্বাস্থ্যনীতি চিকিঔসকদের নীতি না সামগ্রীক ভাবে স্বাস্থ্য টিম ব্যবস্থাপনা নীতি এদিকে খেয়াল রাখতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে, কি ভাবে বাড়াবে তার উল্লেখ থাকতে হবে।

১২. জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হলে কত জনবল দরকার বলা হয়নি।

১৩. একটি সুষ্ঠু স্বাস্থ্যনীতি হলে সেখানে বর্তমানে কত ডাক্তার আছে, ২০২০ সালে কত ডাক্তার দরকার হবে, এটা পরিস্কার ভাবে থাকা উচিত ছিল। জনবল কম থাকলে তা কি ভাবে পূরণ করা হবে তার কোন নির্দেশনা এই খসড়ায় নেই।

১৪. যেখানে গ্রামে এখনো ৮০% প্রসব হয় দাইমার হাতে সেই দাইমাদের ব্যাপারে সুস্পষ্ট নীতি প্রয়োজন।

১৫. পুরো স্বাস্থ্যনীতিকে প্রতিরোধের চেয়ে প্রতিকারের দিকে নেয়া হয়েছে। অর্থাঔ চিকিঔসা নীতি হয়েছে মাত্র।

১৬. বেসরকারীকরণের বিষয়ে আরও বেশি উঔসাহিত করা হয়েছে, যা মানুষের স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার অধিকারের পথে প্রধান অন্তরায়।

১৭. স্বাস্থ্য বাণিজ্য রোধে সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম বিষয়ে দিকনির্দেশনা জরুরি।

১৮. বিশেষায়িত সেবা খাত বেসরকারী করণ উচিত হবে না।

১৯. পরিবেশ দূষণের কারণে অসংক্রামক ব্যধির অন্যতম কারণ এ বিষয়টি সম্পৃক্ত করতে হবে।

২০. মানসিক ও সামাজিক রোগের কারণ ও সমস্যাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে স্বাস্থ্যনীতিতে উল্লেখ করতে হবে।

২১. স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ছাড়া অন্যান্য মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য নীতির সাথে কিভাবে সম্পৃক্ত করা হবে তা বর্ণনা করা উচিত।

২২. অন্যান্য বিদ্যমান নীতিমালা ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যনীতি যাতে সাংঘর্ষিক না হয়, অন্যান্য নীতি প্রয়োগে স্বাস্থ্যের প্রশ্ন যেন অগ্রাধিকার পায় তা থাকা প্রয়োজন।

২৩. অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া বা পরিকল্পনা সম্পর্কে সুনিদ্রিষ্ট দিক নির্দেশনা বাঞ্চনীয়।

২৪. পানি ও পয়নিষ্কাশন জনস্বাস্থ্যের এই জরুরী বিষয়টি স্পষ্ট ভাবে থাকতে হবে।

২৫. প্রতিবন্ধীদের বিকলাঙ্গ লেখা হয়েছে এটা আপত্তিজনক। প্রতিবন্ধী হ্রাস বলা হয়েছে আসলে বলতে হবে প্রতিবন্ধীতা হ্রাস।

২৬. ইউনানি ও আয়ুর্বেদ চিকিঔসার বিষয়ে কোন দিক নির্দেশনা এই নীতিতে নেই।

 

এছাড়া আমাদের মূল বক্তব্য হচ্ছে জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি, ২০১০ অবশ্যই চুরান্ত হওয়া দরকার তবে এই নীতি চুরান্ত হওয়ার আগে সরকার আরো জনমত গ্রহণ করবেন এবং সরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার অধিকার, রোগ প্রতিরোধে খাদ্য ও পুষ্টির নিশ্চয়তা, পরিবেশ দুষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে যুগপোযোগী স্বাস্থ্যনীতি করার উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। আমরা স্বাস্থ্য আন্দোলনের পক্ষ থেকে বলতে চাই, সরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে দুর্বল রেখে বেসরকারীকরণ করার নীতি আত্বঘাতি হবে। বেসরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার কথাও খুবই দুর্বলভাবে আছে। আমরা একটি গণমুখি স্বাস্থ্য নীতির দাবি পুনরায় তুলে ধরছি। সেই সাথে একটি অধিকার কমিশন গঠনের প্রস্তাব এই স্বাস্থ্যনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানাচ্ছি। স্বাস্থ্য অধিকার কমিশন শুধু চিকিঔসক দিয়ে নয়, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য অধিকার রক্ষার জন্যে পরিবেশ, নারী অধিকার, শিশু অধিকার, শ্রমিকসহ সংশিব্জষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হবে।

বার্তা প্রেরক

সীমা দাস সীমু

View: 9 Leave comments (0) Bookmark and Share